Birth place of sridhar swami Mayurgram

Birth place of sridhar swami Mayurgram

Birth place of sridhar swami-Mayur gram

ভাগবতের সর্ব প্রাচীন টীকাকার গনের মধ্যে শ্রীধর স্বামীর টীকা সর্বাধিক প্রচলিত কারণ প্রাচীন টীকাকার গনের মধ্যে তার রচিত টীকাই ভাগবতের পূর্ণাঙ্গ টীকা, তার পূর্বাচার্য্য গণের রচিত টীকা বর্তমানে পাওয়া যায় না। তার টীকার দ্বারাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভূ ভাগবত আস্বাদন করতেন। নিজ শ্রীমুখে শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভূ বলেছেন শ্রীধরস্বামী জগৎগুরু, তার কৃপায় জগতে ভাগবতের অর্থ প্রকাশিত হয়েছে তাই তিনি তাকে গুরু রূপে মানেন। তার ভাগবতের টীকার অনুসরণেই শ্রীজীব গোস্বামী, শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী ঠাকুর ভাগবত ব্যাখ্যা করেছেন।

Sridhar Swami Temple
ওড়িশার বালাশোর জেলার রেমুণার কাছে ময়ূরগ্রামে‌ তার জন্মস্থান। তার নামে ময়ূরগ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে। আগে এখানে শ্রীধরস্বামী জন্মস্থান পরিষদ দ্বারা নির্মিত একটি স্মৃতি স্তম্ভ ছিল। বর্তমানে তার জন্মস্থানে ইসকন একটি মন্দির নির্মাণ করেছে।
মতান্তরে তার জন্মস্থান গুজরাতের বালোডি জেলায়। কোনো কোনো পন্ডিতদের মতে তার লেখা থেকে আভাস পাওয়া যায় তিনি তৈলঙ্গী ব্রাহ্মণ ছিলেন।
শ্যামানন্দ প্রকাশ গ্রন্থে উল্লেখ আছে রেমুণার কাছে ময়ূরগ্রামে শ্যামানন্দ প্রভূ  শ্রীধরস্বামীর জন্মস্থান দর্শনে এসেছিলেন।
শ্রীধরস্বামীর স্থানে গমন করিল।
দর্শন মাত্রেতে ধুলায় গড়াগড়ি দিল।।
বলদেব নাম তিনবার উচ্চারিল।
মহাপ্রভু যৈছে নরোত্তমে প্রকাশিল।। (শ্যামানন্দ প্রকাশ দশম দশা)

Mayur gram Village
শ্রীধরস্বামী চরিত:-
১৩০১ খ্রীঃ এ মাঘ শুক্লা সপ্তমী তে  তার জন্ম হয়। জন্মের পরেই তিনি মাতৃহারা হয়েছিলেন। তার পিতা সংসারের অনিত্যতা অনুভব করে সন্ন্যাস নেওয়া মনস্থ করেন। কিন্তু মাতৃহারা  সদ্যোজাত পুত্রকে কে পালন করবে ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখনই দেখেন ঘরের চাল থেকে একটি টিকটিকির ডিম পরে ভেঙ্গে গেল। ডিম ভেঙ্গে বাচ্চা বেরিয়েই সামনে পোকা দেখে ছুটে খেতে গেল। এই দৃশ্য দেখে তিনি বিবেচনা করেন যিনি জন্ম দিয়েছেন তিনিই পালন করবেন। তাই সদ্যোজাত পুত্রকে ঘরে রেখে তিনি সন্ন্যাস গ্রহন করে চলে যান। গ্রামের এক নিঃসন্তান মহিলা এই শিশুকে পালন করেন। একদিন বালক শ্রীধর মাঠে গোচারণ করতে গেছিল। পথ দিয়ে এক সাধু যাচ্ছিল। তিনি তাকে ডেকে বললেন বাবা একটু জল দেবে। শ্রীধর কাছের পুকুর থেকে জল ও বনের গাছ থেকে ফল এনে তাকে দিলেন। সাধু খুশি হয়ে তাকে বললেন বাবা তোমার নাম কি? সে বলল শ্রীধর। সাধু বলল বাঃ বেশ নাম তো তোমার। যেমন নাম কাজেও‌ তেমন হয়ে ওঠো। তুমি কাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসো? সে তার মহিষ কে দেখিয়ে বললো আমার এই ভঁইসা লক্ষ্মী কে। বেশ তুমি এই দুটি নাম সারাদিন জপকরো। সাধুর কৃপায় নাম জপ করতে করতে তার সুকৃতির উদয় হয়। এই সাধুই তার গুরুদেব পরমানন্দ।
একদিন শ্রীধর মাঠে গোরু চরাচ্ছে, সে একটি ফুটো কলসী নিয়ে তার গোরু দের জন্য জল নিয়ে আসছিল। কিন্তু জল আনতে আনতেই ফুটো কলসী দিয়ে সব জল পড়ে যাচ্ছিল। এদিকে দৈবক্রমে সেখানকার  রাজা শিকারে বেরিয়েছিল।শিকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে সেই বনে বিশ্রাম করছিলেন। রাজা ও মন্ত্রীর মধ্যে কথা হচ্ছিল। মন্ত্রী বলছিল ভগবানের কৃপায় সব সম্ভব হয়। রাজা তা মানতে চাইছিলনা ভগবান চাইলে ও সব সম্ভব হতে পারেনা। তখন রাজা দেখল সেই বালক বার বার ফুটো কলসি দিয়ে জল আনছে আর আনতে আনতেই তা পড়ে যাচ্ছে। তা দেখে রাজা হেসে বললো মন্ত্রী ভগবান চাইলে কি এই মুর্খ বালক ও মহা পন্ডিত হতে পারে? মন্ত্রী বললো হ্যাঁ ভগবানের কৃপা হলে এই মহামুর্খ ও মহাপন্ডিত হতে পারে। রাজা বললো বেশ একে রাজধানী তে নিয়ে চলো দেখি এ কেমন পন্ডিত হয়।
শ্রীধর কে মন্ত্রী নিয়ে এসে রাজপন্ডিতের কাছে পাঠালো শাস্ত্রের তাৎপর্য্য শেখার জন্য। কিন্তু শ্রীধরের তো অক্ষর জ্ঞান ও নেই। সেই সাধু পরমানন্দ তাকে যে নরসিংহ মন্ত্র দিয়েছিল তা জপ করতে করতে শ্রীধরের হৃদয়ে আপনা থেকেই সমস্ত শাস্ত্রের তাৎপর্য্য প্রকাশিত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই শ্রীধর মহাপন্ডিত হয়ে ওঠেন। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
শ্রীধর স্বামী তার গুরুদেব পরমানন্দের কৃপায় নৃসিংহ মন্ত্র জপ করে মহাপন্ডিত হয়ে উঠেছিলেন  ভাগবতের টীকার মঙ্গলাচরণে সেই গুরু ও ইষ্টদেবের কৃপার কথা বর্ণনা করেছেন।
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুর্লঙ্ঘয়তে গিরিং।
যৎ কৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দ মাধবম্।।
অনুবাদ:- মূক ও যার কৃপায় অনর্গল কথা বলতে পারে, পঙ্গু ও যার কৃপায় পর্বতে উঠতে পারে সেই গুরুদেব পরমানন্দ ও ইষ্টদেব মাধব কে বন্দনা করি।
শ্রী নৃসিংহ দেবের কৃপাতেই যে তার অন্তরে ভাগবত জ্ঞানের প্রকাশ হয়েছে তার ও উল্লেখ রয়েছে ভাবার্থ দীপিকায়।
শ্রীধরস্বামী তার ভাগবত দ্বাদশ স্কন্দের টীকা র মঙ্গলাচরণেও তার গুরুদেবের নামোল্লেখ করেছেন।
শ্রীগুরু পরমানন্দং বন্দে আনন্দবিগ্রহম্।
যস্য সন্নতিমাত্রেণ চিদানন্দায়তে বপুঃ।।
ভক্তমাল গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে—
তার সময়ে অদ্বৈতবাদের বহুল প্রচার হয়েছিল। তাই মায়াবাদী দের আকর্ষণ করার জন্য তিনি এমন ভাবে তার টীকা রচনা করেন যেন অদ্বৈতবাদীদের মনে হয় এই গ্রন্থ মায়াবাদী মত সম্মত। মাছ যেমন বড়শি তে আটকানো মাংস খন্ড দেখে বুঝতে পারেনা আসলে বড়শি রয়েছে, তেমন মায়াবাদমত সম্মত ভেবে অদ্বৈতবাদীরা ভাগবতের প্রতি আকৃষ্ট হবে।
তার ভাবার্থদীপিকায় শ্লোকে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় অদ্বৈতবাদ রয়েছে। কিন্তু শুদ্ধ ভক্ত কখনো মায়াবাদপ্রচার করেন না। তাই এই শ্লোকের টীকার অন্তর্নিহিত অর্থ ভেদাভেদ দর্শন সম্মত।‌
যাই হোক সেই সময় তার রচিত ভাগবত অর্থ ব্যাখ্যা দেখে অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী রা প্রবল বিরোধিতা করেন। কাশীতে মায়াবাদী সম্প্রদায়ের প্রধান আচার্য্য গন তাকে শাস্ত্রার্থ করতে আহ্বান করেন। তার কাছে শাস্ত্রার্থ করতে পরাজিত হয়ে তারা বলেন যদিও বিতর্কে শ্রীধর ই জয়ী কিন্তু আচার্য্য শঙ্করের সিদ্ধান্ত সম্মত না হওয়ায় স্বয়ং বিশ্বনাথ মহাদেব ই বিচারক হোন। রাত্রে মন্দির বন্ধ হওয়ার সময় বিশ্বনাথের শয়নের পর  তার সামনে শ্রীধরের গ্রন্থ ও অদ্বৈতবাদী গ্রন্থ রেখে দেওয়া হোক। সেইমত সেইদিন রাতে সকল গ্রন্থ বিশ্বনাথের সামনে রেখে পূজারী মন্দিরের দরজা বন্ধ করে গালা দিয়ে মোহর দিলেন। পরদিন সকালে মন্দিরের দরজা খুলে দেখা গেল সকল গ্রন্থের উপরে রয়েছে শ্রীধরের গ্রন্থ। ও তার গ্রন্থে স্বয়ং মহাদেব লিখে রেখেছেন—
ব্যাসং বেত্তি শুকং বেত্তি রাজন বেত্তি ন বেত্তি বা।
শ্রীধর সকলং বেত্তি শ্রীনৃসিংহ প্রসাদতঃ।।
অনুবাদ:-
পরবর্তী কালেও চার সম্প্রদায়ের আচার্য্য গন শ্রীধরস্বামীর অনুসরণেই গীতা ও  ভাগবতের টীকা রচনা করেছেন।
শেষ জীবনে তিনি কপিলাশে কাটান। ওড়িশার ঢেঙ্কানলের কপিলাশ পাহাড়ে  তার সমাধি আছে। 

শ্রীধর স্বামীর গুরু পরম্পরা ও সম্প্রদায়   বিস্তারিত লিঙ্ক
অনেকে মনে করেন অদ্বৈতবাদী সম্প্রদায়ে এক সময়  ভক্তি মতবাদ বহুল প্রচলন লাভ করে। অদ্বৈতবাদী হয়েও কোনো কোনো আচার্য্যরা ভক্তি অনুশীলন করতেন। মাধবেন্দ্রপুরী, ঈশ্বরপুরী, চৈতন্য মহাপ্রভূ যেমন মায়াবাদী সন্ন্যাস নিলেও তারা ভক্ত ই ছিলেন তেমন শ্রীধর স্বামী ও অদ্বৈতবাদী হয়েও ভক্তি অনুশীলন করতেন।
কিন্তু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভূপাদ এই মত খন্ডন করে প্রমাণ করেছেন তিনি রুদ্র সম্প্রদায়ী শুদ্ধাদ্বৈত পরম্পরাবলম্বী। তার গুরু পরম্পরা তিনি উল্লেখ করেছেন—
১) তিনি বিষ্ণুস্বামী সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন, কারন তার রচিত গ্রন্থাবলীতে বিষ্ণুস্বামী রচিত সর্বজ্ঞ সুক্ত ইত্যাদি থেকে সিদ্ধান্ত উদ্ধার করেছেন। যেমন বিষ্ণুপুরাণ টীকা ১/১২/৭০ এ “তদুক্তং সর্বজ্ঞসূক্তৌ"
ভাবার্থ দীপিকায় ১/৭/৬ এ বিষ্ণুস্বামীর মত দ্বারা সংক্ষেপে ভাগবতের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। “তদুক্তং বিষ্ণুস্বামিনা হ্লাদিন্যা সংবিদাশ্লিষ্টঃ সচ্চিদানন্দ ঈশ্বরঃ। স্বাবিদ্যাসংবৃতো জীবঃ সংক্লেশনিকরাকরঃ।। স ঈশো যদ্বশো মায়া স জীবো যস্তয়ার্দিতঃ। স্বাবির্ভূতপরানন্দঃ স্বাবি্রভূতসুদুঃখভূঃ।  স্বাদৃগুত্থবিপর্যাসভবভেদজভীশুচঃ। যন্মায়য়া জুষন্নাস্তে তমিমং নৃহরিং নুমঃ।।
এছাড়া ও ভাবার্থ দীপিকায় ৩/১২/১-২ ও ১০/৮৭/২১ বিষ্ণুস্বামীর মত ব্যাখ্যা করেছেন।
২) তিনি ভাগবতের টীকার প্রথমেই অদ্বৈতবাদী দের একমাত্র পরমপুরুষার্থ মোক্ষ কে কৈতব বা কপটতা বলে নিন্দা করেছেন।
৩) শ্রীজীব গোস্বামী ও তত্ত্ব সন্দর্ভে তাকে পরমবৈষ্ণব বলেছেন 
৪) অনেকে এই যুক্তি দেখান যে শ্রীধর স্বামী গীতা সুবোধিনী টীকা মঙ্গলাচরনে বলেছেন তিনি আচার্য্য শঙ্করের টীকা অনুসরনে ব্যাখ্যা করেছেন।
ভাষ্যকারমতং সম্যক তদ্ব্যাখ্যাতুর্গিরস্তথা।
যথামতি সমালোক্য গীতাব্যাখ্যাং সমারভে।।
আমি ভাষ্যকার ও তার ব্যাখ্যাকারীর মত অবগত হয়ে ও তা গীতার অর্থের সঙ্গত না হওয়ায় গীতাশাস্ত্রের ব্যাখ্যা আরম্ভ করলাম।
তিনি অদ্বৈতবাদী সম্প্রদায়ের হলে সম্মানের সাথে আচার্য্য শঙ্করের নাম নিতেন কেবল ভাষ্যকার বলে উল্লেখ করতেন না। আর যদি শঙ্করের মতের সাথে তিনি সহমত হতেন তো শঙ্করের ভাষ্যেরই ব্যাখ্যা করতেন। পৃথক করে সুবোধিনী টীকা রচনা করতেন না। 
বিস্তারিত পড়ুন
Goshala
শ্রীধর স্বামীর রচিত গ্রন্থাবলী:-
শ্রীমদ ভগবদগীতার সুবোধিনী টীকা, শ্রীমদভাগবতমের ভাবার্থদীপিকা টীকা, বিষ্ণুপুরাণের  স্বাত্মপ্রমোদিনী টীকা, অথর্ববেদের কর্ম সমুচ্চয় নামক টীকা। ২০ টি শ্লোকের ব্রজবিহার কাব্য
শ্রীরূপ গোস্বামী তার পদ্যাবলীতে শ্রীধর স্বামী রচিত ৩টি  শ্লোক উদ্ধার করেছেন।

মৌড়গ্রাম শ্রীধরস্বামী স্মৃতিপরিষদ 




শ্রীধরস্বামী স্মৃতি পরিষদ, মৌড়ীগ্রাম, বালাশোর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শ্রীধর স্বামীর বিগ্রহ


শ্রীধরস্বামীর স্বহস্তে লিখিত পুঁথি


ওড়িশার কপিলাশে শ্রীধরস্বামীর সমাধি


কিভাবে যাবেন:- রেমুণা ক্ষীরচোরা গোপীনাথ মন্দির থেকে মাধবেন্দ্রপুরীর সমাধি যাওয়ার পথে বামদিকে যে রাস্তা চলে গেছে সেটি মৌর গ্রাম যাওয়ার রাস্তা।

নিকটবর্তী স্টেশন:-হাওড়া পুরী রেলপথে বালাসোর স্টেশন পড়ে। বালাসোর থেকে রেমুনা নিয়মিত অটো ও বাস যায়।
দর্শনীয় স্থান:- শ্রীধর স্বামীর মন্দির।

Google map direction